আমার  জানা সহজে উচ্চারণ করা যায় এমন দুটি শব্দ: মা আর চা।

একটা তো সবার কাছেই আপন আর অন্যটি ছাড়া হয়না আপ্যায়ণ। আমার কাছে দুটিই আপন। শুনেছি নিজের দুর্বলতা বলা বারণ- কিন্তু আমারটা আমি বলে দিচ্ছি: আমার মা আর তার হাতের এক কাপ চা- এই আমার দুর্বলতা। তাই বলে ভাববেন না আমি ঘোরতর চা খোর! নিয়মিত সকল-সন্ধ্যা দু’বেলা চা চাই আর বোনাস মাঝে মাঝে মাঝরাতে। কোন কোন দিন আমি আর মা এর মধ্যে এক অসম প্রতিযোগিতা চলে: কে কার থেকে ভাল চা বানাতে পারে। বলতে দ্বিধা নেই আমি কালে ভদ্রে জিতি। তবে সেই বিজয়ে আনন্দের চেয়ে আক্ষেপই বেশি। কারণ হেরে গেলে মা আর এক কাপ বানিয়ে খাওয়াবে। হয়ত সেই লোভে পড়ে বিধাতার কাছে নিজের পরাজয়ের জন্য প্রার্থনা করি- তিনি আমাকে বিমুখ করেন না!

যে চা নিয়ে এতক্ষণ ধরে চিবাচ্ছি সে অনেক ধরনের হতে পারে; ব্লাক টী, গ্রীন টী, লেমন টী, কোকনাট টী … আরো কত কী! বাসায় মা আর আমি দুজনই দুধ চা খাই। ইদানিং আমি অবশ্য চর্বি কমানোর ব্রতে দুধ  চা থেকে বিরত থাকার চেষ্টায় রত আছি। বাধ সাধলেন মা- দুধ চা ছাড়া চা- ই চেনেন না, চিনতে ও চান না। বাসায় গ্রীন টি, মসলা টি ইত্যাদি রেখে দেখেছি- কোন লাভ হইনি; কোনটি ছুয়ে দেখেননি। একটা ব্যাপার লক্ষ্য করে দেখেছি আমি না থাকলে মা একা চা করেন না নিজের জন্য। তাই বলতে পারেন মায়ের জন্যই দুধ চা খাওয়ার অভ্যাস টা ইচ্ছা থাকলে ও ছাড়তে পারলাম না। ক’দিন ই বা বাচবেন- তাই যতদিন পারি দু’বেলা একসাথে বসে ভাত না খেতে পারলেও চা খাই। জানেন, মা’কে আমি মিথ্যা বলিনা। হয় সত্য বলি -না হয় কিছু বলি না। তবে এই একটা ব্যাপার ছাড়া। নিজেকে আমি স্বাস্থসচেতন দলের একজন ভাবি। তবু আমাকে নিয়ে মা’এর ভাবনা ভরা। বেশি চা খেলে শরীর কড়া করবে, ঘুম কমবে এই ভয়ে তিনি ভীত। তাই বাইরে থেকে ফিরলেই জিজ্ঞেস করে:

কয় কাপ খেয়েছিস আজ?

প্রথম প্রথম কয়েকদিন খেয়াল করে দেখেছি – যদি সত্য বলতাম তাহলে আর সন্ধায় চা বানাত না- তার ও আর সেই বেলায় চা খাওয়া হতো না। এরপর থেকে আমি নতুন ফন্দি পেতেছি: বাসায় ঢুকতে ঢুকতেই মা কে ডেকে বলি – “চা বানাও” সেই তারাহুড়ায় সে আর জেরা করার সুযোগ পায় না। এর দুই সুবিধা: আমাকে আর সত্য চেপে যেতে হয় না উপরন্ত মা আমার সন্ধায় চা না খেয়ে থাকে না, সাথে আমার এক কাপ তো আছেই। ক্ষতি কী?

যেখানেই যাই সেখানেই পারলে এক কাপ চা চেখে দেখি। হয়ত মনে মনে সেই চায়ের সাথে মা’এর হাতের চায়ের তুলনা করি । ভুল বুঝবেন না! বন্ধু মহলের অনেকের মায়ের হাতের চা খাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। অসাধারণ সব স্বাদের সমারোহ! কেউ কারো থেকে কম যান না। আমার মনে হয় সব মা মমতা দিয়ে চা বানায় বলেই এত সেরা হয়!

মাস কয়েক আগে সপ্তাহে ৩দিন মিরপুর যেতাম জার্মান শিখতে। মিরপুর খুব বেশি চিনি না তাই প্রথম সপ্তাহটা আসে পাশে চষে বেরিয়েছি একটা ভাল চায়ের দোকানের খোজে। দোকান ভাল না হলে অসুবিধা নাই ; চা ভাল হলেই চলবে। দিন চারেক পর খুজে পেলাম এক দোকান। সেই সার্চ এর সুযোগে আট টা ভিন্ন দোকানে চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। তারপর দোকান ঠিক হল। দোকানদার বুঝে গেল, তাই দূর থেকে আমাকে সাইকেল করে আসতে দেখলেই চা বানানো শুরু করে দিত। ক্লাসে ঢোকার আগে এক কাপ, শেষ করে ফেরার পথে আরেক কাপ। শীতকাল ছিল বলে খুব সুবিধা হতো। খুব গরম এক কাপ চা খেয়ে খোশ মেজাজে কনকনে শীতে বাসায় আসতাম। এখন অবশ্য আর যাওয়া হয় না ওদিকটা তে। রাস্তাঘাট ও বদলে গেছে, নতুন উড়াল সড়ক উদ্বোধন হয়েছে। আশা করি পুরানো চায়ের দোকান টা ঠিক আছে।

বেশ কিছুদিন ধরে আমি, আমার মা আর এক চাপ চা এর কথা লিখব ভাবছিলাম– হয়ে ওঠেনি। মা দিবস এর কথা মাথায় ছিল কিন্তু ইচ্ছা ছিল না। মা’ এর জন্য লিখতে আবার আলাদা দিবস লাগে নাকি? মা’কে ঘিরেই তো আমার প্রতিটি দিবস। তবু ভাল লাগে- আমার জন্মদিন আর মা দিবস কাছাকাছি হবার কারণে। ১৪ ই মে আসলেই আমি মোবাইল কে চুপ করিয়ে রাখি; পাছে SMS আর কলের প্রবাহে মা এর মনে পড়ে যায় আমার জন্মদিন এর কথা! মজার ব্যাপার হল মা মনে রাখতে পারে না দিনটার কথা। তাই বরাবর আমি সারপ্রাইজ দিই মনে করিয়ে দিয়ে। বলে:

কি উপহার চাও আমার কাছে?

বলি: সুন্দর এই পৃথিবীটা দেখাতে আমাকে এনেছ, এটাই আমার শ্রেষ্ঠ উপহার

 

মা আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকে। কি দ্যাখে?

ঘোর এর গভীরতা ভাঙাতে আমি বলি: জলদি জলদি এক কাপ চা দাও


Leave a Reply

Your email address will not be published.