দু’দিন হল দ্বিতীয়বারের মত দ্বি-চক্রযান কিনেছি। দিক বিদিক ঘুরে মনের মত একটা পেলাম, দু’চোখ বন্ধ করে কিনে নিলাম। বার্লিন আছি দু’বছর। এখানে আসার পরপরই কিনব কিনব করছিলাম কিন্তু দাম-দর-দর্শনে মেলেনি বলে কেনা হয়নি। পছন্দ না হলে অযথা পয়সা খরচ করে কেনার মানে দেখি না। প্রয়োজন পড়ত- যদি বিনা পয়সার মেট্রো কার্ড না পাওয়া যেত ভার্সিটি থেকে। বার্লিন বাইক চালানোর জন্য ভালো, সমতল শহর।
প্রথম বাইক কিনেছিলাম ২০১১ সালে। ওইসময় ঢাকায় বাইক কেনার একরকম হিড়িক পড়ে গেল। আমি বলব সেটা ভালো ধরনের হিড়িক। বিডি- সাইক্লিস্ট এর প্রবক্তারা এর প্রশংসার দাবিদার। তাদের প্রচার প্রচারণার জন্য ঢাকার মত ব্যাস্ত শহরে বাহারি বাইকের আনাগোনা বেড়ে গেল। পাল্লা দিয়ে কে কত দাম দিয়ে বাইক কেনে সেটার প্রতিযোগিতা। একদিকে রাতারাতি বিদেশি বাইকের আমদানি বাড়ল সেই সাথে চতুর চোরেরা চুরি রপ্তানির বাজার ধরে ফেলল। এরকমই এক দুর্দিনে আমার প্রথম বাইক কেনা। অনেকটা হুট করে। একদিন হায়াত ভাই’র ফোনঃ
– পাগলা বাইক কিনবি?
কোনকিছু না জেনে উত্তর দিলাম ” কিনব”
তিনি তখন নতুন নতুন বাইক নিয়েছেন। দলে লোক ভেড়ানোর চেষ্টা করছেন। আমি কিনব কিনব্ করছিলাম সেটা তিনি জানতেন। কিন্তু অত টাকা দিয়ে আমি নতুন বাইক কিনতে সাহস করছিলাম না। কেউ যদি বিক্রি করে দেয় তাহলে নিব। আমাদের এক কলিগ- গালিব ভাই বিক্রি করে দিবেন। একেবারে নতুন । শখের বসে কিনেছিলেন ; শারীরিক ভাবে নিজেকে ব্যস্ত রাখার তাগিদে। একদিন অফিসে দেখাতে নিয়ে আনলেন। প্রথম দেখাতেই পছন্দ হয়ে গেল। সোনালি রঙের Fuji।
first-bike
তো বাইক কেনা হয়ে গেল। বাসায় নিয়ে এলাম। প্রথমে বেঁকে বসল বাসার দারোয়ান। কিছুতেই লিফট এ করে উপড়ে ওঠাতে দিবে না। কমিটির বারণ। কারণ?
– ওটা ভারী তো (শুনে তাজ্জব বনে গেলাম)
– মাপার যন্ত্র নিয়ে আসনে। ১৫ কেজি ও হবে না।
(উপরে নিয়ে আসলাম। ছোট ঘরের বাসা। বাইক ঘরের একটা বিশাল জায়গা নিয়ে নিল। এরপর থেকে আন্ডারগ্রাউন্ড এ রাখতাম।)
এরপর আম্মা মুখ বেঁকে থাকল। তার কিছুতেই বুঝে আসে না , আমি, যে কিনা কোনদিন বাইক ছুঁয়েই দেখিনি সে কিভাবে ঢাকার রাস্তায় বাইক চালানোর কথা ভাবতে পারি! ঘটনা সত্য। সেদিনের আগে আমি কখনো বাইক চালানো শিখিনি। চেষ্টাও করিনি। গোঁড়ামি আর রাগ একমাত্র কারণ।
আব্বা খুব চেষ্টা করেছিলেন আমাকে দিয়ে বাইক চালানোর। আমি নার্সারি তে পড়াকালীন সময়ে তিনি ঢাকা থেকে কড়া লাল রঙের একটা বাইক নিয়ে আসলেন। তার আশা ছিল আমার আগ্রহ জন্মাবে- শিখে নিয়ে স্কুলে যাব। শিখব কি- বাইকে চরার উপায় নাই। সাইজে আমার থেকে ডাবল। কি কারণে যে আব্বা ওই সাইজের বাইক কিনেছিলেন আমি জানি না। একবার দুইবার নাড়াচাড়া করে আর চড়ার সাহস করলাম না। ঘটনা যেটা ঘটল- আমার বাইক দিয়ে আসে পাশের বাচ্চাকাচ্চারা, আত্মীয় স্বজনেরা শিখে গেল। আমি অশিক্ষিত থেকে গেলাম।
এরপর আমি আর কোনদিন বাইক ছুঁয়ে দেখিনি। সবার শেখার পালা শেষ হলে লাল বাইকের বসবাস বাসার গোডাউনে ছিল।
কেনার দিন দু এক বার চেষ্টা করতেই হয়ে গিয়েছিল। চালিয়ে বাসায় নিয়ে এসেছি। এরপর থেকে বাইক ই বাহন হয়ে গেল। ব্যাস্ত ঢাকার যেখানে গিয়েছি বাইক করে গিয়েছি । টাইম আর টাকা কমে- চর্বির খরচ বেড়ে গেল। মনে আছে মারুফ ভাই, হায়াত ভাই আর সাইখ সবাই মিলে বসুন্ধরা থেকে জিগাতলা গিয়েছিলাম। ওটাই প্রথম বারের মত লম্বা রাইড। এরপর বহুবার বিভিন্ন জাগায় যাওয়া হয়েছিল। একসময় চাকরি বদল করে গুলশান ১ এ অফিস হল। বাসা থেকে আসতে আসতে গা ভিজে যেত। অফিস ঢুকে চেঞ্জ করে নিতাম। যানজটে বসে দাঁত খিটমিট করার থেকে আরামের ছিল। চলার মাঝে আনন্দ অন্যরকম।
বছর দুই পরে ঢাকা ছাড়ার সময় এল। বাইরে চলে যাবার আগে বাইক টা বিক্রি করে দিতে চাইলাম। তুর্য একসময় মোটরবাইক চালাতো। একটা অ্যাকসিডেন্ট এর পরে সেটা বন্ধ করে দিল। আমি বাইক কেনার পর বেশ কয়েকবার বলেছিলাম কেনার জন্য। গা করেনি । শেষ চেষ্টা করলাম আর একবার চেষ্টা করে আমার বাইক তা রেখে দিতে বললাম । সে নিল না (পরে সে ঠিকই বাইক কিনেছে)। অন্য খদ্দের ঠিক হল। যত আনুষঙ্গিক ছিল দিয়ে দিলাম- হেলমেট ছাড়া। ওটা হায়াত ভাইয়ের কাছ থেকে আবদার করে আমার টার সাথে পরিবর্তন করে নিয়েছিলাম যাতে করে আমার সোনালি বাইকের সাথে সোনালি হেলমেট হয়। বলতে পারেন গিফট মনে করে সেটা বিক্রি করতে চাইনি। আম্মা ধুয়ে মুছে আলমারিতে রেখে দিয়েছে।
বাংলাদেশে বাইক চালানোর গল্প ওই পর্যন্ত। এরপর বিদেশের গল্প। প্রথম পর্ব প্যারিসে। তখন সবে গিয়ে পৌঁছেছি। সপ্তাহ খানেক পরে ক্লাস শুরু হল। ভার্সিটি ছিল শহরের মাঝখানে- বিখ্যাত নটরডেম চার্চের পাশে। পাতালরেল করে যেতে ৪০ মিনিট লাগত। আর বাসা থেকে বের হওয়া নিয়ে ঘণ্টা খানেক। টিকেট এর দাম চড়া । প্রথম দিকে ১০টা টিকেট এর বান্ডিল কিনে নিতাম। কিছুটা সাশ্রয় হত। বেকার ছিলাম বলে খরচটা গায়ে লাগতো। একদিন আমার ফ্লাটমেট (আমার ভার্সিটি তে ম্যাথম্যাটিকস এ পড়ত) আমাকে বললঃ তুমি বাইক নিয়ে যাওনা কেন? ৩০ মিনিট লাগে মাত্র। খোজ নিয়ে দেখলাম শহরের বাইক শেয়ারিং সিস্টেম “Velib” (ফ্রেঞ্চ শব্দ Vélo= সাইকেল ) সারা বছরের জন্য স্টুডেন্টদের কে মাত্র ২৯ ইউরো তে বাইক ব্যাবহার করতে দেয়। শহর জুড়ে প্রতি ৫০০ মিটার পর পর বাইক স্টেশন আছে। কার্ড পাঞ্চ করে বাইক নিয়ে ৪০ মিনিটের মধ্যে যে কোন স্টেশনে ফেরত দিতে পারবেন । বাড়তি সময় রাখলে বাড়তি ফী। সে খরচটা ও উশুল কড়া সম্ভব। আপনি যদি একটু দূরের কোন স্টেশনে যেখানে available বাইকের সংখ্যা কম সেখানে রেখে আসেন তাহলে বাড়তি পয়েন্ট পাবেন যেটা বাড়তি সময় বাইক রাখার ক্ষেত্রে খরচ করা যাবে। ২০০৭ সালে চালু হওয়া এই বাইক শেয়ারিং সিস্টেম লোকাল- ফরেনার সবার মধ্যে সমান জনপ্রিয়। অনেক সুবিধাঃ আপনার নিজের বাইক কিনতে হবে না। চুরি যাওয়া নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। মেরামতের ঝামেলা নেই। রাস্তার মাঝখানে চাকা পাংচার হয়ে গেলে আর একটা নিয়ে নিবেন। মোবাইল অ্যাপ্স থেকে চট করে দেখে নিলেন আশেপাশে কোথায় কয়টা বাইক আছে, কোথায় জমা দিলে বাড়তি পয়েন্ট পাওয়া যাবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। ট্যুরিস্ট রা পছন্দ করে কারণ খরচ অনেক কম। সারা দিনের জন্য নিলে মাত্র ১.৭০ ইউরো , একটা মেট্রো রাইড নিতে গেলে এর থেকে বেশি লাগবে। শহর- সরকারের উদ্যোগের কারণ পরিবেশ বান্ধব পরিবহন ব্যাবস্থা গড়ে তোলা যাতে করে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যাবহার আর যানজট কমে। গতবছর (২০১৫ ) থেকে প্যারিসে বছরের একটি দিন পুরো শহর যানবাহন মুক্ত রাখা হচ্ছে।
প্রথমদিকে খরচ বাঁচানোর জন্য বাইক চালানো শুরু করলাম। একটা সময় পার্টটাইম জব হয়ে যাওয়াতে মাসিক মেট্রো কার্ড কম খরচে হয়ে গেল। তারপর ও রাত ২- ৩টার দিকে কাজ শেষ করে যখনমেট্রো চলতো না তখনো শীতের রাতে বাইক করে বাসায় ফেরা সুবিধাজনক ছিল।
একসময় শহর বদল করে বার্লিন এলাম। এখানের প্রেক্ষাপট আলাদা। জার্মানিতে চমকে যাবার ব্যাপার হল – এখানে মেট্রো স্টেশন গুলোতে ব্যারিয়ার নেই। ধরেই নেয়া হয় যে আপনি সচেতন ভাবে টিকেট কেটে (এবং validate করে) চড়েছেন। কেউ চুরি করে উঠলে আচমকা সাদা পোশাকে থাকা চেকার চড়া ফাইন করবে। তবে সুবিধা হল ছাত্রছাত্রীদের ভার্সিটির রেজিস্ট্রেশনের সাথে মেট্রো পাস যুক্ত। বার্লিন বিশাল- বিস্তৃত। এখানে বাইক শেয়ারিং এর প্রচলন কম। প্রত্যেকেরই নিজের বাইক আছে বলা চলে। প্রতিটা ফ্যামিলি বাসার সামনে দেখা যাবে পরিবারের সবার জন্য একটা করে বাইক।
সামনের দিন গুলোতে হয়তো আর ফ্রি মেট্রো টিকেট পাব না। তাই বলে তো চলা থেমে থাকবে না। তখন দু’ চাকায় হবে দিক বিদিক দর্শন।bike-2

Leave a Reply

Your email address will not be published.